Home পৌরাণিক কাহিনী জগন্নাথ কে? কেন তিনি রথে?

জগন্নাথ কে? কেন তিনি রথে?

by banganews

জগন্নাথদেবের উৎস নিয়ে নানা মুনির নানা মত। নানা ধর্মের নানা মত। তবে কাহিনি হিসেবে যা প্রচলিত, সেই কথাই বলা ভালো। জগন্নাথদেবের বৃত্তান্ত জানতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে সেই ত্রেতা যুগে। রামচন্দ্রের কাছে। যে সময়ে তিনি গাছের আড়াল থেকে তির মেরে সুগ্রীবের ভাই বালির ভবলীলা সাঙ্গ করলেন।

কথিত আছে, এমন অনভিপ্রেতভাবে বালির মৃত্যুর কারণ হওয়ার পর বিষণ্ণ হয়ে পড়েন রামচন্দ্র স্বয়ং। তিনি তাঁর নিজের জন্য এর এক প্রায়শ্চিত্ত লেখেন।

রাম অবতারের সেই প্রায়শ্চিত্ত-লেখনী সার্থক হল কৃষ্ণ অবতারে এসে। তিনি স্বয়ং যে ব্যাধের বিষমাখানো তিরে নিহত হন, জরা নামের সেই ব্যাধই ত্রেতা যুগের বালির জন্মান্তর।

কৃষ্ণের আকস্মিক মৃত্যুর খবর পেয়ে দ্বারকায় ছুটলেন শোকাকুল অর্জুন। দেহ সৎকার করার সময় দেখা গেল কৃষ্ণশরীরের নাভির একটি অংশ কিছুতেই আগুনের গ্রাসে যাচ্ছে না। ঠিক সে সময় অর্জুনের প্রতি দৈববাণী হল, ওই অংশটি সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে। অনুগত অর্জুন তাই করলেন।

আরেক মত বলে, কৃষ্ণশরীরের বেশ কিছু অস্থি আগুন পোড়াতে পারেনি। সেগুলি ভাসিয়ে দেওয়া হয় সমুদ্রে। এদিকে কৃষ্ণের শোকে আকুল বলরাম আর সুভদ্রাও প্রাণত্যাগ করেন সমুদ্রে।

আরো পড়ুন – আজ রথযাত্রা – লোকারণ্য ধুমধাম ছাড়াই করোনা আবহে পুরীর রথযাত্রা

তাঁদের মিলিত অস্থি দীর্ঘকাল ধরে সমুদ্রের জলে ভেসে আসতে থাকে।

ভারতের আরেক প্রান্তে পুরী ভূখণ্ডের রাজা তখন ইন্দ্রদ্যুম্ন। তিনি এক রাতে স্বপ্নে নির্দেশ পেলেন, সমুদ্রে কৃষ্ণ-বলরাম-সুভদ্রার দেহাবশেষ ভেসে আসছে। সেই দেহাবশেষগুলি তাঁদের তিনটি কাষ্ঠশরীরের মধ্যে সংরক্ষণ করতে হবে।

তৈরি করতে হবে তিনটি মূর্তি।

পরদিন সকালেই শশব্যস্ত মহারাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন সমুদ্রের স্রোতে ভেসে আসা সেই অতি পবিত্র সম্পদ স্বচক্ষে দেখলেন। যত্ন করে তুলেও আনলেন নিজের কাছে। কিন্তু মূর্তি তৈরি করবেন কে?

ঠিক তখনই রাজবাড়িতে ছদ্মবেশে এসে উপস্থিত দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। বৃদ্ধ ব্রাহ্মণবেশী বিশ্বকর্মা বসলেন মূর্তি নির্মাণে। শর্ত রইল, তিনি নিজে না খোলা অবধি নির্মাণ-ঘরের বন্ধ দরজা কেউ খুলতে পারবেন না। অন্যথা হলেই শিল্পী অদৃশ্য হয়ে যাবেন।

এদিকে দু মাস কেটে গেলেও দরজা খোলে না। ভেতরে কোনও শব্দও নেই। ব্যাকুল রাজা একদিন শর্ত ভুলে খুলে ফেললেন দরজা।

ব্যস। সেই শিল্পী আর নেই। সামনে দাঁড়িয়ে তিনটি অসমাপ্ত মূর্তি। সেই তিন অসম্পূর্ণ মূর্তিকেই মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করলেন মহারাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন।

অবশ্য ভিন্ন আরেকটি কাহিনি বলে, স্বপ্নাদিষ্ট রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের প্রতিনিধি বিদ্যাপতি শ্রীকৃষ্ণের দেহাবশেষ খুঁজতে খুঁজতে তা পেয়েছিলেন শবর জাতির আরাধ্য দেবতা নীলমাধবের মধ্যে। তিনিই জগন্নাথ। আদেশপ্রাপ্ত মহারাজা তাঁকে পুরীতে প্রতিষ্ঠা করেন।

জগন্নাথদেবের বিবরণ তো হল। কিন্তু রথ?

জনশ্রুতি বলছে, সে আরেক কাহিনি। বড় হৃদয়স্পর্শী কথা। একবার শ্রীকৃষ্ণের রানিরা বলরামের মা রোহিনীকে ধরে বসেন। তাঁদের ব্রজভূমির কথা শোনাতেই হবে। কেন এখনও ব্রজবাসীদের নাম করতে করতে মূর্ছিতপ্রায় হয়ে পড়েন কৃষ্ণ স্বয়ং।

মা-রোহিনী তাঁদের ব্রজভূমির কথা বলতে বসলেন। তবে দাদার এই জীবনটা ছোট বোনের শোনা উচিত নয় ভেবে কৃষ্ণ-বলরামের বোন সুভদ্রাকে দিলেন সরিয়ে।

সুভদ্রা কিন্তু বেশি দূরে যেতে পারলেন না। ব্রজের মধুর কথায় তাঁর শরীর নিস্পন্দ হয়ে এল। চোখ বিস্ফারিত। স্থির। ওই অবস্থাতেই তিনি ঘরের অদূরে দাঁড়িয়ে রইলেন। কাষ্ঠবৎ। কৃষ্ণ-বলরাম সে সময় বাইরে থেকে ফিরছেন প্রাসাদে। বোনের ওই অবস্থা দূর থেকে দেখে এগিয়ে এলে তাঁদের কানেও ব্রজমাধুরী বর্ষিত হল। মা-রোহিনী তখনও বলছেন। অবিরাম। কৃষ্ণ-বলরাম সুভদ্রার দু পাশে স্থির হয়ে রইলেন। বোনের মতোই অবস্থা তাঁদেরও।

আরো পড়ুন – আজ রথযাত্রা – লোকারণ্য ধুমধাম ছাড়াই করোনা আবহে পুরীর রথযাত্রা

ঠিক সে সময় সেখানটিতে হাজির নারদমুনি। এমন নিস্পন্দ ত্রিমূর্তিকে দেখে তিনি বিস্ময়ে অভিভূত। মুগ্ধ। তাঁদের প্রণাম করে প্রার্থনা করলেন, এমনই মধুময় অবস্থায় তাঁরা যেন আপামর প্রাণীকে দর্শন দেন। প্রাণিজগৎ তবে ধন্য হয়ে যাবে।

কৃষ্ণ বললেন—তথাস্তু।

সেই দর্শনই দিলেন তাঁরা। কলিকালে। আপামর মরজগৎ রথোপরি এই তিন মধুর মূর্তি দর্শন করে জন্মান্তর ভোলে। মধুরে মধু হয়ে মিশে যায়। মিশে যায় অনন্ত আবেগে।

তাই তো রথযাত্রা।

You may also like

1 comment

Leave a Reply!