Home প্রযুক্তি ধর্ষণের হাত থেকে মেয়েদের রক্ষা করবে বাংলার গবেষকদের তৈরি এই আধুনিক হাতঘড়ি – ‘ওকেয়ার’ (ওমেন সেফটি ডিভাইস)

ধর্ষণের হাত থেকে মেয়েদের রক্ষা করবে বাংলার গবেষকদের তৈরি এই আধুনিক হাতঘড়ি – ‘ওকেয়ার’ (ওমেন সেফটি ডিভাইস)

by banganews

ধর্ষণের হাত থেকে মেয়েদের রক্ষা করবে বাংলার গবেষকদের তৈরি এই আধুনিক হাতঘড়ি – ‘ওকেয়ার’ (ওমেন সেফটি ডিভাইস) লিখলেন সায়নী মুখার্জী ।

এখন সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজের পাতা উল্টানোর সময় প্রায় প্রতিদিন চোখে পড়ে বাসে ট্রেনে রাস্তায় নারী নির্যাতন আর ধর্ষণের ঘটনা৷ একটুকরো দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমরাও পাতা ওল্টাই, চোখ সরিয়ে নিই৷ মোমবাতি মিছিল, নীরবতা। সমাধানহীন সুরক্ষাহীন জীবনে বাস্তবিক চিত্রটা বড়  নিষ্ঠুর৷

নির্ভয়া  গণধর্ষণ মামলার সাত বছর পেরিয়ে গেছে, ফেসবুক থেকে রাস্তা সর্বত্র প্রতিবাদ মিছিল , সরকারি আইন  প্রণয়,  সবকিছুর পরেও আজও ধর্ষণ হয়ে চলেছে৷ পরিসংখ্যান বলছে, দিল্লিতে প্রতিদিন প্রায় ৫ টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ২০১৮ সালে থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের সমীক্ষায় নারীদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশ ভারত।   কিন্তু পরিসংখ্যানের দিকে আমরা আর তাকাব না কারণ এটা ডিপ্রেসিং৷  এবার সমাধান চাই। কী করতে পারি আমরা?

আরো পড়ুন – উইট্রান্সফার নেই চিন্তা করবেন না এসে গেছে প্রেরক

মহিলাদের সুরক্ষার জন্য আত্মরক্ষার  কী কী রয়েছে আমাদের হাতে?  গোলমরিচ স্প্রে, সঙ্গে ছুরি রাখা এইটুকুই৷ কিন্তু একজন মহিলাকে একাধিক ধর্ষক হামলা করলে এই গোলমরিচ স্প্রে ব্যাগ থেকে বের করা কিংবা ঠিক জায়গায় সঠিক পদ্ধতিতে আঘাত করতে যে মানসিক এবং শারীরিক শক্তি  প্রয়োজন সেই সেল্ফ ডিফেন্সের প্রশিক্ষণ আমাদের দেশে খুবই কম৷   এখন কিছু স্মার্টফোন অ্যাপস রয়েছে যা আপনি আপনার ফোনে ইনস্টল করে রাখলে বিপদে পড়লে আপনাকে অ্যাপে একটি কী ( বোতাম) প্রেস করলে  আপনার পরিবারের সদস্য জানতে পারবেন আপনি বিপদে আছেন।  কিন্তু সবসময় বিপদের মধ্যে ফোন ব্যবহার করার পরিস্থিতি নাও থাকতে পারে৷ আক্রমনকারী প্রথমেই যদি আপনার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে ফেলে দেয় তখন কীভাবে আপনি ফোনের সুরক্ষা এ্যাপ ব্যবহার করবেন? ইদানীং শকিং বুট আত্মরক্ষার জন্য জনপ্রিয় হয়েছে কিন্তু আপনার মা ঠাকুমা বা একেবারে ছোটো বাচ্চাকে এই শকিং বুট পরানো আরামদায়ক নয়, এবং শকিং বুট সামগ্রিক সুরক্ষা দিতে পারে না৷ তাহলে উপায় কী?

আরো পড়ুন – আমেরিকার মিউজিয়াম থেকে অপসারিত শ্বেতাঙ্গ ক্ষমতার প্রতিভু থিওডোর রুজভেল্টের মূর্তি

আর আমাদের মেয়েদের ভয় পাওয়ার কারণ নেই৷ বাংলার গবেষকরা তৈরি করেছেন এমন একটি  স্মার্টওয়াচ যেটা আপনি বাইরে যাওয়ার সময় হাতে পরতে পারেন বা গলায় হারের সঙ্গে লকেটের মত পরে থাকলে আপনার সুরক্ষা আপনার নিজের হাতেই থাকবে৷ কীভাবে?  আসুন দেখে নিই

ভিডিওতে  দুটি বাস্তব জীবনের সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে৷  এই দুটি ফুটেজে আপনি দেখতে পাবেন যে, দুটি ভিন্ন মেয়ে দু’জন পৃথক আক্রমণকারী দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। ফোনের এ্যাপ এবং লোকেশন ট্র্যাকিং এর কথা সবাই জানে। তাই প্রথমেই আক্রমণকারী ফোনটি ফেলে দেয়৷  এবার যদি আপনার হাতে ‘ওকেয়ার’ স্মার্টওয়াচ থাকে তাহলে ফোন ছাড়াই আপনি সুরক্ষিত থাকবেন৷ আপনাকে ঘড়ির ব্যান্ডে একটি সুইচ টিপতে হবে এবং এটি আপনার স্মার্টফোনের মাধ্যমে আপনার পরিবারের সদস্যদের আপনার বিপদের খবর পৌঁছে দেবে।  এই  ডিভাইসটি কোনও ধরণের স্মার্টফোনের উপর নির্ভর করবে না এবং এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিপদ শনাক্ত করার ক্ষমতাও থাকবে।

ছবিতে দেখুন ওকেয়ার

ছবিতে বা ভিডিওতে আকারে বড় ‘ওকেয়ার’ দেখতে পেলেও বাস্তবে এটি ছোট হাতঘড়ির মতই হবে।

এটি সংগ্রহ করার জন্য প্রথমেই আপনাকে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে৷ প্রত্যেকটি গাড়ির যেমন একটি বৈধ নম্বর থাকে সেভাবেই এটিরও রেজিষ্ট্রেশন নম্বর থাকবে৷ যাতে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করা যায়৷ নিশ্চয়ই ভাবছেন একটা ছোট ঘড়ি কীভাবে আপনাকে সুরক্ষা দেবে?  রেজিষ্ট্রেশন সম্পূর্ণ হলে এই ডিভাইস ফোনের মতই চার্জ দিতে হবে৷ বাইরে বেরোনোর সময় আপনাকে হাতে ডিভাইসটি পরতে হবে এবং  একটি বোতাম টিপে ডিভাইসটি চালু করতে হবে। শুরুতে কয়েক সেকেন্ড লোড হবে,তারপর রেডি হয়ে যাবে কাজ করার জন্য৷ আপনি বিপদে পড়লে ডিভাইসটি নিজেই আপনার কাছের মানুষ এবং লোকাল থানায়   জানিয়ে দেবে আপনি বিপদে পড়েছেন৷ কীভাবে জানাবে?

পাঁচটি  উপায়ে  ওকেয়ার আপনার বিপদের খবর পৌঁছে দেবে৷

১/ আপনাকে ফেসবকুএর মতই লগ ইন আইডি আর পাসওয়ার্ড দিয়ে একটি এ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে৷ আপনার চারপশে যাদের কাছে ওকেয়ার এ্যাকাউন্ট থাকবে তারা প্রত্যকেই  আপনি বিপদে পড়লে জানতে পারবেন৷

২/এতে একটি বোতাম আছে সেটি অন করলেই ডিভাইস সক্রিয় হয়ে যাবে৷ কিন্তু যদি আপনি নিজে অন করতে না পারেন তাহলে

৩/ একবার নাড়ালেই ডিভাইসটি অন হয়ে যাবে৷ এই ভাইব্রেশন  বা কাঁপানোর  ধরণটি ব্যবহারকারী নিজের পছন্দমত সেট করতে পারবেন৷ কিন্তু যদি আপনার দুটো হাত বাঁধা থাকে আপনি ডিভাইটি সঠিক ভাবে নাড়াতে না পারেন তাহলে

৪/ একটি কোড ওয়ার্ড আপনাকে বলতে হবে ডিভাইটি অন করার জন্য৷ ঠিক আমরা যেভাবে পাসওয়ার্ড সেট করি সেভাবেই এক বা একাধিক শব্দ আপনি ডিভাইসঅন করার জন্য সেট করে রাখবেন৷ সাধারণত বিপদে পড়লে আমরা বাঁচাও বলে থাকি৷ এবার এই বাঁচাও শব্দটিকে যদি আপনি আপনার কোড হিসেবে সিলেক্ট করেন তাহলে বাঁচাও বলার সঙ্গে সঙ্গে ডিভাইস অন হয়ে যাবে৷  আপনি এক্ষেত্রে পছন্দ মত সেভ মি, হেল্প মি, বিপদ ইত্যাদি শব্দ নির্বাচন করতে পারবেন৷ কিন্তু যদি আপনার মুখ বাঁধা থাকে তাহলে আপনি কিছুই বলতে পারবেন না৷ সেক্ষেত্রেও উপায় আছে৷

৫/ আপনার হৃদস্ন্দন শুনেই ডিভাইস নিজেই আপনার বিপদের কথা জানতে পারবে এবংআপনাকে সুরক্ষা দেবে৷

এবার বলি ডিভাইস কীভাবে আপনাকে সুরক্ষা দেবে

এমার্জেন্সি কল লিসটে আপনি আপনার কাছের যে সমস্ত মানুষের ফোন নম্বর ইমেল ডিভাইসে সেভ করে রাখবেন আপনি বিপদে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিভাইস টি এস এম এস, কল এবং ইমেল করে আপনার বিপদের খবর জানিয়ে দেবে এবং আপনি কোথায় বিপদে পড়েছেন তাও ডিভাইসটি জানাবে৷

শুধু কাছের মানুষের কাছে ফোন ইমেল নয়,  লোকাল থানায় ডিভাইস খবর পৌঁছে দেবে এবং আপনাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কী কী ভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে সমস্ত কিছুই ক্লাউডের মাধ্যমে রেকর্ডহতে থাকবে৷ লোকাল থানায় ইমেলের মাধ্যমে লিঙ্ক টি পাওয়ার পর থেকেই পুলিশ আপনার অবস্থান, আপনার ছবি,  কথোপকথন সবটাই ভিডিওর মাধ্যমে দেখতে  পারবেন৷ সেই মত যথাস্থানে পৌঁছে যেতে পারবেন৷ টুইটারেও আপনার হয়ে ডিভাইস স্ট্যাটাস দেবে আপনি বিপদে পড়েছেন৷ ধরা যাক লিখল “মিস সায়নী ইস ইন ডেঞ্জার৷ সেভ হার৷”   এর ফলে আপনার একাধিক বন্ধু জানতে পারবেন এবংঅন্যকে জানিয়ে, সাহায্য করতে পারবেন ।  ফোনের সেটিংসর মতই আপনি প্রয়োজনে কল লিস্ট কোড ওয়ার্ড সবকিছুই পরিবর্তন করতে পারবেন৷

প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি যেসব ক্ষেত্রে ধর্ষণ করার পর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সেক্ষেত্রে মানুষটির সঙ্গে সঙ্গে ডিভাইসটাও আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়ে যাবে একথা সত্যি৷ কিন্তু ক্লাউডে সমস্ত কিছুই রেকর্ড হয়ে থাকবে৷ তাই বিচারের বাণী আর প্রমাণের অভাবে  নীরবে নিভৃতে কাঁদবে না বরং সমস্ত তথ্য প্রমাণ সহজেই পাওয়া যাবে এবং উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া যাবে৷ অন্যায় করে অপরাধী আর কোনোভাবেই নিজেকে আড়াল করতে পারবে না৷

আমাদের মেয়েদের সুরক্ষার কথা ভেবে যারা এই ওকেয়ার স্মার্ট ওয়াচটি তৈরি করেছেন তাদের সঙ্গে পরিচয় করে নিই৷

অয়ন দে, গবেষক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়৷

ড. সুকৃতি ভট্টাচার্য – গবেষক, অধ্যাপক , Luxembourg

এবং বিটেক পাঠরত তিন ছাত্র,  নারুলা ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির অরিজিৎ দাস,সৌরদীপ দাস, এবং রাহুল দত্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়৷

অয়ন দে’র সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, তারা এই ডিভাইসটি তৈরি করেছেন বাংলা তথা দেশের মা বোনের সুরক্ষার জন্য৷ অয়ন দে জানিয়েছেন ইতিমধ্যেই তারা  পেটেন্টের জন্য আবেদন করেছেন৷ তাদের ইচ্ছে যদি রাজ্য এবং কেন্দ্র সরকার  তাদের সহায়তা করেন৷ রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মেয়েদের যাতায়াতের সুবিধের জন্য সবুজ সাথী প্রকল্পে সাইকেল দিয়েছেন যেমন, তেমনই ঘরে ঘরে মা বোনের জীবনের সুরক্ষার জন্য যদি এই ওকেয়ার পৌঁছে দিতে পারেন তাহলে সমস্ত মেয়েরা সুরক্ষা পাবে৷ ওকেয়ার ছাড়াও ভবিষ্যতে তাদের আরও কিছু করার পরিকল্পনা রয়েছে মানুষের জন্য। স্পার্কলার্স নামে গবেষকদের একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে।

পেজের লিঙ্ক দেওয়া হল – https://www.facebook.com/sparklers2018/

 

 

 

 

You may also like

1 comment

Leave a Reply!