Home দেশ রুমা গুহঠাকুরতা কেবলমাত্র কিশোর কুমারের প্রাক্তন স্ত্রী নন তাঁর মৃত্যু বঙ্গ সংস্কৃতির একটি যুগাবসান

রুমা গুহঠাকুরতা কেবলমাত্র কিশোর কুমারের প্রাক্তন স্ত্রী নন তাঁর মৃত্যু বঙ্গ সংস্কৃতির একটি যুগাবসান

by banganews

রুমা গুহঠাকুরতা – বঙ্গ সংস্কৃতির একটি যুগাবসান
সায়নী মুখার্জী –

ফেসবুক খুলতেই এখন চোখে পড়ে একঝাঁক যুবক যুবতী ত্রাণ সংগ্রহ করছেন লেখার বিনিময়ে, আঁকার বিনিময়ে, আম্ফান বিধ্বস্ত মানুষের জন্য কখনও পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য৷ ফেসবুকের দৌলতে আজ সবকিছুর ডকুমেন্টটেশন সম্ভব হয়েছে৷কিন্তু মানুষের পাশে থাকার এই প্রয়াস বহুদিনের৷ ক্যালকাটা ইউথ কয়ারের প্রথম অনুষ্ঠান হয়েছি বন্যাত্রাণ সংগ্রহের জন্য৷

কথায় আছে, কলকাতাকে জানতে গেলে কলকাতার গানকে জানতে হয়। আর কলকাতার গানকে জানতে হলে যা যা জানতে হয়, তাদের একটি হলো ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার। আর কয়্যারের কথা উঠলে সঙ্গে সঙ্গে উঠে তার পরিচালিকা ও সংগঠক রুমা গুহঠাকুরতার কথা। ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারকে যিনি বর্ণনা করেন তার ‘চতুর্থ সন্তান’ বলে। ১৯৯০ সালে এক সাক্ষাৎকারে জানান,তাঁর অভিনয় বা গানের প্রশংসা শুনলে তিনি যতটা না খুশি হন, ততটাই হন কয়্যারের ভূমিকা স্বীকৃতি পেলে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ধাত্রীর মমতায় যিনি কয়্যারকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। রুমা গুহঠাকুরতা আর ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার এক অবিচ্ছেদ্য নাম। আগে ছিল শুধুই গানের অনুষ্ঠান, পরে যোগ হয়েছে নাচ। তবে কয়্যারের মূল সম্পদ হচ্ছে তার শিল্পী দল। গানের দিকটা পুরোটাই রুমা গুহঠাকুরতার নিয়ন্ত্রণে ছিল আর নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন শম্ভু ভট্টাচার্য এবং রাম গোপাল ভট্টাচার্য, সহকারী পিনাকী রায়। ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারের সোনালি অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রুমা গুহঠাকুরতার স্মৃতি। বাঙালির কাছে ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারের স্মৃতি আজও জ্বলজ্বলে। জন্মলগ্ন থেকেই সংস্থাটি নতুন যৌবনের দূত।কফি হাউসের আড্ডা, হেমন্ত-মান্না কিংবা উত্তম-সুচিত্রা, হেমন্ত-সলিলের মতোই যেন ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার আজও কলকাতার অহঙ্কার। আর রুমা গুহঠাকুরতা সেখানে অলঙ্কার হয়ে থাকবেন অনাগত দিনগুলোতে।

ব্যক্তিগত জীবনের ওঠাপড়া কখনোই এই মানুষটিকে সৃষ্টিবিমুখ করেননি৷ একদিকে কিশোর কুমারের সঙ্গে সম্পর্কে ভাঙন বিবাহবিচ্ছেদ , অন্যদিকে বাংলা সংস্কৃতি জগতে এক অধ্যায়ের সূচনা । বম্বেতেই প্রথম কয়্যার শুরু করেন সলিল চৌধুরী৷ সেখানেই রুমা গুহঠাকুরতা তাদের সঙ্গে যুক্ত হন৷ শৈলেন্দ্রর ভাষ্যপাঠ এবং লিড গিটারে সলিল চৌধুরি প্রথম অনুষ্ঠানেই সাড়া ফেলে দেন৷

কিন্তু কিছুদিন পর রুমাদেবী কলকাতায় চলে আসেন পাকাপাকিভাবে৷ ভাঙন ধরে বম্বে ইউথ কয়ারে। বিভিন্ন সিনেমার গানে সলিল চৌধুরি জনপ্রিয়তা পেলেও মনের টানে নতুন করে কলকাতায় কয়্যার শুরু করতে বলেন রুমা গুহ ঠাকুরতাকে৷ ইচ্ছে ছিল এমন গান গাইবেন যা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে এবং দেশের মঙ্গল হবে৷ ১৯৫৮ তে নতুন একদল ছেলেমেয়ে নিয়ে যাত্রা শুরু হল৷ ১৯৫৯ নিউ এম্পায়ার বন্যাদুর্গত মানুষের সাহায্যের জন্য প্রথম অনুষ্ঠান হল ক্যালকাটা ইউথ কয়্যারের৷ সভাপতি ছিলেন রুমা গুহঠাকুরতার মানিক মামা অর্থাৎ সত্যজিৎ রায়৷ প্রথম থেকেই দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। পণ্ডিত রবিশংকরের সুরসৃষ্টি স্বাগতম স্বাগতম, সুধীন দাশগুপ্তের কথায় সুরে “ওই উজ্জ্বল দিন” ওয়াই এস মুলকির ভারতবর্ষ সূর্যের এক নাম এসব গান আজও মানুষের মনে প্রেরণা সঞ্চার করে।

আরো পড়ুন – তবলায় দারুণ হাত থাকলেও সঙ্গত কথাটায় ছিল তীব্র আপত্তি। ‘সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন’ এর মত ব্যাপারটা মনে হত গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের

গীতিকার শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়এর সঙ্গে সাঙ্গিতীক বোঝাপড়া এতটাই সহজ ছিল যে সুর রুমাদেবী চাইছেন সেই সুরের মত করেই গান লিখতেন শিবদাস বাবু৷ অনেক সময় বিদেশি গানের থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে বাংলা গান বানানো হয়েছে৷ পহ্যারি বেলাফন্টে রুমা গুহঠাকুরতাকে পরিচয় করিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রতিভাবান অভিনেত্রী হিসেবে৷ হ্যারি বেলাফন্টের জামাইকা ফেয়ারওয়েল একটি প্রেমের গান। সেই গানের সুরে শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতবর্ষকে ভালোবেসে লেখেন
সাগর নদী কত দেখেছি দেশ আর পাহাড়ে সোনালী সূর্যোদয়
আমি দেখেছি দ্বীপ কত অন্তরীপ আর শিশির রাত্রে বনে চন্দ্রোদয়
তবু ভরে না মন হায় ভরে না মন
। ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারের নাম এক সময়ে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলা গণসঙ্গীতে ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার পথিকৃৎ হয়ে ওঠে। সকলের মুখে মুখে ঘুরত এই নাম। আজকাল যেমন প্রতিবাদের ভাষা মিম তখন ছিল গণসঙ্গীত৷ সঙ্গীতের একটি ধারা, যা মূলতঃ রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক শোষণ, নির্যাতন, অত্যাচার অনাচারের বিরুদ্ধে গণ মানুষকে উদ্দীপ্ত করার গান৷বাংলায় গণসঙ্গীত জনপ্রিয়তা লাভ করে ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারের হাত ধরেই। যে বছর কিশোর কুমারের সঙ্গে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়, সে বছরই ১৯৫৮ সালে সুরকার সলীল চৌধুরী ও চিত্র পরিচালক, সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে একত্রে ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারের প্রতিষ্ঠা করেন রুমা। শিবদাস বন্দোপাধ্যায়ের লেখা ভি বালসরার সুরে ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারের ‘আজ যত যুদ্ধবাজ’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। ১৯৭৪ সালে রুমা গুহ ঠাকুরতার পরিচালিত ২০ সদস্যের ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার কোপেনহেগেন ইউথ ফেস্টিভেল-এ সেখানকার হাজার হাজার শ্রোতা ও বিচারকদের মন জয় করে নেয়। জিতে নেয় প্রথম পুরস্কার।

আরো পড়ুন – টমাস স্টিভেন্স সানফ্রানসিসকো থেকে রওনা হয়ে সাইকেলেই সর্বপ্রথম বিশ্বভ্রমণ করেন৷

বম্বেতে থাকাকালীন সময়ে গুরু আব্দুর রহমান খাঁ সাহেবের কাছে বছরখানেক তালিম নিয়েছিলেন৷গুরুর কাছে রুমা যে গানটি শিখেছিলেন পরবর্তকালে সত্যজিৎ রায় অভিযান ছবিতে সেই গান ব্যবহার করেন৷ রুমা গুহঠাকুরতা “বাজে করুণ সুরে ‘ গানটি কোন যন্ত্রানুসঙ্গ ছাড়া খালি গলায় কেবল তাণপুরা সঙ্গে গেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায় এর সিনেমায়৷ কিশোর কুমারের সঙ্গে গাওয়া “এই তো হেথায় কুঞ্জছায়ায় “শোনেননি এমন বাঙালি বোধহয় নেই৷ রবীন্দ্রনাথের গান হোক বা প্রতিবাদের, প্রেমের এমনকি হাস্যরসাত্মক সমস্ত রকম গানেই রুমা গুহঠাকুরতা ছিলেন সমান পারদর্শী। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে গেয়েছিলেন আশিতে আসিও না ছবির এই গান, যা তার বহুমুখী প্রতিভার পরিচয়বাহী৷ গানটি হল-
তুমি আকাশ এখন যদি হতে আমি বলাকার মত পাখা মেলতাম
তুমি ময়দা এখন যদি হতে জলখাবারে লুচি বেলতাম
যেমন গান, তেমনই অভিনয়। ১৯৮২ তে অমৃতকুম্ভের সন্ধানে ছবিতে তার আবেগঘন অভিনয় দর্শকের মনে থেকে গেছে৷ আশিতে আসিও না, বাঘিনী, পলাতক-এর মত বিভিন্ন সিনেমায় গান গেয়েছেন। বালিকা বধূ কিংবা দাদার কীর্তি ছবিতে বীণার মা যে চরিত্রে যখনসেই চরিত্র যেন তার জন্যই তৈরি হয়েছে৷ তাঁর অভিনীত শেষ ছবি মীরা নায়ার পরিচালিত ‘দ্য নেমসেক’ মুক্তি পায় ২০০৬ সালে।

You may also like

2 comments

Leave a Reply!