Home পৌরাণিক কাহিনী মহালয়া কেন? কী তার কাহিনি?

মহালয়া কেন? কী তার কাহিনি?

by banganews

মহুয়া বন্দ্যোপাধ্যায়

মহালয়া। চণ্ডীপাঠ। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। আর এই সব অপূর্ব জোটপাটের মানে—মা আসছেন। তবে আশ্চর্যের কথা হল, মহালয়া দিয়ে দুর্গাপুজোর সূচনা বটে, কিন্তু মহালয়ার সঙ্গে সরাসরি এই মহাপুজোর সম্পর্ক নেই। তাহলে মহালয়ার বন্ধন কার সঙ্গে?
আমাদের পরলোকগত পিতৃপুরুষদের জন্যই মহালয়া। অমাবস্যার এই দিনটিই পিতৃপক্ষের শেষ দিন কিনা!
মহালয়ার সঙ্গে পিতৃপক্ষের কী সম্পর্ক? সে এক চমৎকার আখ্যান। আসছি সেই কথায়। তার আগে শুনে নিই ‘মহালয়া’ শব্দটির অর্থ।
মহালয়া শব্দটি তিনটি ভাগে বিভক্ত।

আরও পড়ুন লকডাউনের সিনেমা, যা ভাবছেন প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা

প্রথম হল “মহ” শব্দ। এই শব্দটির প্রধানত দুটি অর্থ হয়। একটি অর্থ হল পূজা এবং অন্য অর্থটি হল উৎসব। এই শব্দটির সঙ্গে আবার ‘মহৎ’ ব্যাপারটিও জড়িয়ে।
‘মহালয়া’ শব্দটির দ্বিতীয় ভাগ “আলয়”। এর অর্থ হল আশ্রয়।
এখন প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ মিলে শব্দটি দাঁড়ায় “মহালয়”। তার মানে পূজনীয় বা মহৎ আশ্রয়। এই নামে পিতৃলোককে সম্বোধন করা হয়। যেখানে আমাদের বিদেহী পিতৃপুরুষরা অবস্থান করেন। সেই পিতৃলোককে স্মরণের অনুষ্ঠানই হল মহালয়।

শুরুতেই বলেছিলাম, এই পিতৃপুরুষদের স্মরণ করার নেপথ্যে একটি কাহিনি আছে। এবার নাহয় সেই কাহিনিটিই শুনে নেওয়া যাক।

মহাভারতের মহারথী কর্ণকে আমরা সকলেই কমবেশি চিনি। শুধু শক্তিতে মহাবীর নন, দানবীর হিসেবেও কর্ণ স্মরণীয় নাম।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সেই কর্ণের শোচনীয় পরিণতির কাহিনিও জানি সক্কলে। এখানে আমাদের গল্প বরং শুরু হোক তার পরের পর্ব থেকে।

মৃত্যুর পর তাঁর সমস্ত সৎগুণের কারণে কর্ণ পৌঁছলেন স্বর্গে। সপার্ষদ দেবরাজ ইন্দ্র স্বয়ং তাঁকে স্বাগত জানালেন। এবার কর্ণের তো পেয়েছে খিদে। দেবরাজকে সে কথা বলতেই থালায় ভরে মণি মাণিক্য রত্নরাজি এসে হাজির।
কর্ণ তো অবাক! এগুলো খাওয়া যায় নাকি! বিস্মিত কর্ণ দেবরাজকে এমন আচরণের কথা না শুধিয়ে পারলেন না।
“দেবরাজ ইন্দ্র বললেন, সারা জীবন মানুষকে তুমি যা যা দান করেছ, এই নাও। সেগুলোই তোমার সামনে।”
“কিন্তু এগুলো খাদ্য তো নয়। আমার খিদে পেয়েছে যে”—দিশেহারা কর্ণ।
“স্বর্গলোকে তুমি খাদ্য পাবে তখনই, যদি পিতৃপুরুষকে জল-পিণ্ড ইত্যাদি দান করে থাকো। তুমি তো সেটা করোনি”—উত্তর দিলেন দেবরাজ ইন্দ্র।

আরও পড়ুন ৮ হাজার টাকায় বিক্রি হল একটা মাত্র ইলিশ

কর্ণ এবার মরিয়া। তাঁর পিতৃপুরুষের কথা তিনি জেনেছেন মাত্র এই সবে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগের দিন। তাহলে কীভাবে পিতৃলোকের উদ্দেশে জলদান করবেন? সময় পেলেন কোথায়?
দেবরাজ বুঝলেন, কর্ণের যুক্তি সঙ্গত। তিনি এবার কর্ণকে একটা সুযোগ দিলেন—“পৃথিবীতে ফিরে যাও আবার। পিতৃপুরুষকে জলদান করো। তারপর ফের স্বর্গে আসবে।”
কৃতজ্ঞ কর্ণ তাই করলেন। পৃথিবীতে নেমে একপক্ষকাল ধরে পিতৃপুরুষের উদ্দেশে জল-পিণ্ডাদি অর্পণ করলেন। তারপর ফিরলেন স্বর্গে। তাঁর পিতৃলোকের ঋণ মুক্ত হল।
কর্ণের এই একপক্ষকালের পিতৃতর্পণই এরপর থেকে পিতৃপক্ষ হিসেবে প্রসিদ্ধ হল।
মহাভারত থেকেই মূলত এই পিতৃপক্ষ বিষয়টির সৃষ্টি।
তবে একপক্ষকাল বা টানা পনেরোদিন যাঁরা এই পিতৃতর্পণ করতে পারেন না, তাঁদের জন্য শাস্ত্র এক বিধান দিয়েছে। পিতৃপক্ষের শেষ দিন, অমাবস্যায় পিতৃতর্পণ করলেও গোটা পক্ষকালের ফল পাওয়া যায়।
পৃথিবীলোক থেকে মহালয়, অর্থাৎ পিতৃলোকের উদ্দেশে জল-পিণ্ডাদি উৎসর্গ করা হয় এই মহালয়ার দিন। এই ক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই পিতৃপক্ষের সমাপ্তি।

তা বলে মহালয়ার সঙ্গে মহাদেবীর কোনও সম্পর্কই কি নেই? আছে। ওই যে মহালয়া শব্দের শেষভাগ। আ-কার।
আ-কার যুক্ত হওয়া মানেই শক্তির প্রকাশ। স্ত্রীলিঙ্গ।
এখানেই পুরো শব্দটির গভীরতা বেড়েছে অনেকখানি।
পিতৃপক্ষের অবসানে, অন্ধকার অমাবস্যার সীমানা পার করে তবেই আমরা আলোকময় দেবীপক্ষের শুভ আগমনকে অনুভব করতে পারি।
আঁধারের পরই তো আলো। পিতৃপুরুষের আশীর্বাদলাভের পরই আমরা শুভকাজের অধিকারী হতে পারি।
তাই দেবীপক্ষ আসে পিতৃপক্ষের পর। পিতৃলোক তৃপ্ত হলে তবেই না আমরা কোনও পরম শুভ-র আশ্রয় লাভ করতে পারি!
এ কারণেই ‘মহালয়া’ শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ।
তৃপ্ত তুষ্ট পিতৃলোকের আশীর্বাদেই আমরা মহাশক্তির আরাধনার অধিকার লাভ করতে পারি।
সেইজন্যই মহাপুজোর ঠিক আগেই মহালয়া।

You may also like

2 comments

Leave a Reply!