Home Onno Pujo 2020 যেভাবে দুর্গাপুজো করলেন বিভূতিভূষণ, সে সময় তা অবিশ্বাস্য

যেভাবে দুর্গাপুজো করলেন বিভূতিভূষণ, সে সময় তা অবিশ্বাস্য

by banganews

মহুয়া বন্দ্যোপাধ্যায়

বিভূতি যাঁর চরিত্রের ভূষণ, তাঁর তো সবটাই ‘সৃষ্টিছাড়া’ কিনা। একা বিভূতিভূষণই পেরেছিলেন তাই বন্ধ ঘরের দুর্গার দরজাটি আপামরের জন্য খুলে দিতে। বিত্তের পুজো থেকে সে পুজো হয়ে উঠল চিত্তের পুজো।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এ কাহিনি পানিতরের। উত্তর চব্বিশ পরগনার ছোট্ট গ্রাম পানিতর। ‘পথের পাঁচালি’র লেখকের শ্বশুরবাড়ি। পানিতরের বর্ধিষ্ণু বিত্তশালী মানুষ কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়। বসিরহাট আদালতের দুঁদে উকিল। তাঁর মেয়ে গৌরীদেবীর সঙ্গে বিভূতিভূষণের বিয়ে হয় ১৯১৭ সালে। অবশ্য বিয়ের আগে থেকেই শ্বশুর-জামাইয়ের মধ্যে জানাচেনা ভালোই ছিল।

আরও পড়ুন ভারতের কোভ্যাক্সিনের ” জোরালো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ” জানালেন গবেষক

পানিতরের মুখোপাধ্যায় পরিবার ধনগৌরব ছাড়াও আরও একটি বিষয়ের জন্য বিখ্যাত। দুর্গাপুজো। মহা আড়ম্বরে শক্তির আরাধনা করা এই পরিবারের বহুকালের রেওয়াজ। তবে সে সময়ের প্রচলিত রীতি অনুসারে, এই পারিবারিক পুজো শুধুমাত্র পরিবার পরিজন এবং ঘনিষ্ঠদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। ধনী ব্যক্তির পুজোয় সে সময় সম্মানে, মর্যাদায় নিচু কোনও ব্যক্তির প্রবেশাধিকার ছিল না। সে পুজো পরিচালনার ভার পরিবারের বাইরেও কারও হাতে দেওয়া হত না।
কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির দুর্গাপুজোয় বিভূতিভূষণ আসতেন অতিথি হয়ে। পরে মুখোপাধ্যায় পরিবারের জামাই তো হলেন। কিন্তু তারপরেই ঘটল সেই অভাবনীয় ঘটনা। বংশের প্রচলিত রীতির ব্যাত্যয় ঘটিয়ে কালীপ্রসন্ন দুর্গাপুজোর আয়োজনের দায়িত্ব তুলে দিলেন বিভূতিভূষণের হাতে। বিংশ শতাব্দীর সে সময়টাতে এ এক খুব বড় ব্যাত্যয়।
পথই যাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ পাঁচালী, সেই আকাশের মতো মানুষটি এরপর ঘটিয়ে ফেললেন আরও এক অপূর্ব কাণ্ড। মুখোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাদালানের দরজা খুলে দিলেন আপামরের জন্য। দুর্গাপুজোর আয়োজক বিভূতিভূষণের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করতে পারবেন না কেউ। হুকুম ছিল তেমনই। আর পথের মানুষটি দউকদিগন্তের সমস্ত পথকেই এনে সম্মিলিত করলেন মহাশক্তির পদপ্রান্তে। সেই প্রথম পানিতর সহ আশপাশের সমস্ত এলাকার কানাকড়ি-সম্বল সমাজ কাতারে কাতারে ভিড় জমিয়ে ফেলল বর্ণাঢ্য দুর্গাদালানে।
বিভূতিভূষণের প্রতিভায় মুগ্ধ কালীপ্রসন্ন তাঁর এই কাজের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেননি। তিনি দেখেছিলেন, সে সময়ের এক সামান্য স্কুলশিক্ষক মানুষটির কলম এবং হৃদয় দুইয়ের মধ্যে কি নিবিড় যোগাযোগ। এই যোগসূত্রটিকে কোনওমতেই আগল পরাতে চাননি বিভূতিভূষণের শ্বশুরমশাই।


গ্রাম গ্রামান্তরের সকল মানুষের জন্য মুখোপাধ্যায়দের দুর্গাদালান খুলে দিলেন, শুধু নয়। পুজো দেখতে আসা প্রতিটি মানুষকে নিজহাতে প্রসাদ দিলেন। যত্ন করে খাওয়ালেনও।
কে জানে, তখনই হয়তো তাঁর চিত্তে বোনা হচ্ছে ‘পথের পাঁচালী’র বীজ!
বিভূতিভূষণের প্রথমা স্ত্রী, মুখোপাধ্যায় পরিবারের গৌরিদেবী চলে গেলেন ১৯১৯ সালে। তার পরেও বেশ কয়েক বছর এই দুর্গাপুজোর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিলেন বিভূতিভূষণ। সে বন্ধনে ছেদ পড়ল তাঁর ঘাটশিলা চলে যাওয়ার পরে।
তবে ততদিনে বর্ণাঢ্য দুর্গাদালানে আক্ষরিক অর্থেই বর্ণহীনদের অকুণ্ঠ যোগদান ঘটে গেছে। ধনের দুর্গা এসে বসেছেন পানিতরের মনের দুর্গা হয়ে।
এই অতিলৌকিক সংযোগের একমাত্র সেতুর নাম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

You may also like

Leave a Reply!