Home বাংলা মধ্যরাতে সলিল চৌধুরির মাথায় নতুন গানের সুর এলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক পড়ত তার, স্টুডিওতে ঢোকার সময় জানতেন না কী গান গাইবেন! 

মধ্যরাতে সলিল চৌধুরির মাথায় নতুন গানের সুর এলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক পড়ত তার, স্টুডিওতে ঢোকার সময় জানতেন না কী গান গাইবেন! 

by banganews
মধ্যরাতে সলিল চৌধুরির মাথায় নতুন গানের সুর এলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক পড়ত তার, স্টুডিওতে ঢোকার সময় জানতেন না কী গান গাইবেন!
লিখলেন সায়নী মুখার্জী
ভোজপুরি সিনেমার অভিনেতা অসীম কুমার একদিন তার আত্মীয়াকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন আন্ধেরিতে। এক বাঙালি মিউজিক ডিরেক্টর তার কয়্যারের জন্য প্রধান গায়িকা খু্ঁজছেন৷
অসীম কুমার তার পরিচিতাকে নিয়ে যাচ্ছেন যদি একটা সুযোগ পাওয়া যায়৷ দুজনেই সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন এমন সময় শুনতে পেলেন “ঢেউ উঠছে, আলো ফুটছে”, স্বর উঠছে নামছে। হারমোনির কনসেপ্ট তখনও সবার কাছে পরিচিত নয়৷
ঘরে ঢুকতেই দেখা গেল বহু গায়ক গায়িকা যন্ত্রশিল্পীর মাঝে রয়েছেন একজন মানুষ, অসীম কুমার তার আত্মীয়াকে পরিচয় করিয়ে দিলেন বাঙালি ভদ্রলোকের সঙ্গে, নাম সলিল চৌধুরি৷
সলিল চৌধুরি গান গাইতে বললে অসীম কুমারের আত্মীয়া গাইলেন মুকেশের গাওয়া “চন্দন সা বদন, এবং সলিল বুঝলেন তার কয়্যারের লিড সিঙ্গার এসে গেছেন৷ ওহ বলাই হয়নি, এই আত্মীয়া আর কেউ নন, স্বয়ং সবিতা চৌধুরি৷ ১৯৫৮ তে প্রথম সলিল চৌধুরির কথায় সুরে রেকর্ড করলেন সবিতা চৌধুরি দুটি গান, একটি হল সুরের এই ঝর ঝর ঝর্ণা, অন্যটি মরি হায় গো হায়৷ দুটোই সুপারহিট৷
সলিল চৌধুরী এবং সবিতা চৌধুরী দুজনেই তখন থাকেন বম্বেতে৷ একদিন সলিল জানালেন, টেলিগ্রাম এসেছে AIR কলকাতা থেকে, একটা বাংলা গান গাইতে হবে। এদিকে সবিতা চৌধুরী কোনোদিন বাংলা গান করেন নি, ভয় পাচ্ছেন৷ সাহস দিয়ে সঙ্গে করে কলকাতা নিয়ে এলেন সলিল চৌধুরী৷ স্টুডিওতে ঢোকার সময়ও সবিতা চৌধুরি জানেন না কী গান গাইবেন? ঢুকে দেখলেন সব মিউজিশিয়ান বসে আছেন। কার গান গাইবেন জানতে চাইলে সবিতা বলেন তিনি জানেন না৷ সকলে হেসে উঠতেই সলিল চৌধুরি হারমোনিয়াম টেনে নিলেন। স্থায়ীটুকু আগে লেখা থাকলেও অন্তরাটুকু সেখানেই বসে লেখা সুর করার পর সবিতা চৌধুরিকে শেখালেন এবং রেকর্ড করলেন “হলুদ গাঁদার ফুল দে এনে দে৷”
সবিতা চৌধুরির বাবা ছিলেন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর। দিল্লিতেই ক্ল্যাসিকাল শেখেন সবিতা চৌধুরি৷ এরপর বম্বেতে গেলে ঠাকুমা ঘোরতর আপত্তি করেন গান গাওয়া নিয়ে। তাই ঠাকুমার পুজো দেওয়ার সময় টুকুই ছিল গান শেখার সুযোগ৷ রাম লক্ষণ জয়পুরওয়ালা আসতেন বাড়িতে গান শেখাতে৷ বম্বেতে থাকতেই ক্ল্যাসিকাল ছেড়ে ফিল্মের গান গাওয়া। ফাংশানে মুকেশ জির গান গাইতেন, এছাড়াও পুরুষ কন্ঠে গাওয়া গানগুলি নিজে গাইতে পছন্দ করতেন।
সলিল চৌধুরীর সঙ্গে প্রথম আলাপেও গেয়েছিলেন চন্দন সা বদন, তখন বাংলা গান জানতেন না৷ পুজোর বাংলা গানের যে উন্মাদনা তা তিনি জানলেন সলিল চৌধুরির সঙ্গে পরিচয়ের পর৷ নিজেকেও নতুন ভাবে আবিষ্কার করলেন বাংলা গানে।
অসাধারণ একজন গায়িকা হওয়া সত্বেও সবিতা চৌধুরীর অধিক পরিচয় ছিল সলিল চৌধুরীর স্ত্রী হিসেবে। হয়তো সেই কারণেই অন্য কোন সুরকারের গানে তাকে তেমন ভাবে পাওয়া যায়নি। সলিল চৌধুরীর বন্ধু নচিকেতা ঘোষ,ভাই সুহাস এবং সুধীন দাশগুপ্ত এছাড়া অন্য কারো গানে সবিতা চৌধুরির কন্ঠ আমরা শুনতে পাই নি৷
এমন বহুবার হয়েছে অনেক রাতে সলিল চৌধুরীর মাথায় কোন একটা সুর এসেছে সেই সুর কে কন্ঠে স্থাপিত করবার জন্য ডাক পড়েছে সবিতা চৌধুরীর। কিন্তু পরবর্তীকালে সেই গান গেয়েছেন অন্য কোন শিল্পী তাকে শিখিয়েছেন সবিতা চৌধুরী। বহু গান আগে বাংলায় সবিতা গেয়েছেন, তারপর সেটা হিন্দিতে রেকর্ড করা হয়েছে। শিল্পী সবিতা চৌধুরী সবথেকে বেশি খুশি হয়েছিলেন আশা ভোঁসলে এবং ইয়াসুদাস কে গান শিখিয়ে৷ শ্রীকান্তের উইল ছবিতে ইয়াসুদাসের কন্ঠে গাওয়া নাম শকুন্তলা তার গানটি ইয়াসুদাসকে শিখিয়েছিলেন সবিতা চৌধুরি৷
সলিল সবিতা জুটি এক কথায় ছিল অনবদ্য। সলিল চৌধুরী কখনো সবিতা চৌধুরী কে আলাদা করে গানের রেওয়াজ করাতেন না৷ সবিতা চৌধুরী কাজের ফাঁকে ফাঁকে গান তুলতেন৷ এমনও হয়েছে একটা গান রেকর্ড করে ছেলে মেয়েদের স্কুল থেকে আনতে গেছে ফিরে এসে আবার একটা গান রেকর্ড করেছেন। কিন্তু দুটো গান শুনেই বোঝার কোন উপায় নেই। সংসারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হয়তো খুব বেশি গান গাওয়া হয়নি সবিতা চৌধুরীর, কিন্তু যে কটি গান গেয়েছেন সেগুলোই তাকে মনে রাখার জন্য যথেষ্ট। মর্জিনা আব্দুল্লাহ ছবিতে অনুপ ঘোষালের সঙ্গে জুটি বেঁধে দিয়েছিলেন “মার ঝাড়ু মার ঝাড়ু মেরে ” যা আজ কিংবদন্তী। তাঁর কেরিয়ারের সেরা গান কিনু গোয়ালাতে। এখানে আমরা অন্য সবিতা চৌধুরী কে খুঁজে পাই, গান “দখিনা বাতাসে মন কেন কাঁদে “
সলিল চৌধুরীর রোমান্টিক গান গেয়েছেন লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে এবং আরো অনেকে। কিন্তু গণসঙ্গীতের সলিল চৌধুরী সৃষ্টিতে প্রাণ সঞ্চার করেছেন একমাত্র সবিতা চৌধুরী। আমজনতার জন্য সাধারণ মানুষের জীবনে প্রেরণা দিতে যেসব গান সেই গণসংগীত, যা বিপুল জনতার মাঝে দাঁড়িয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে গেয়েছেন সবিতা, আজ এত বছর পরেও যে সব গান শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। তেমনই একটি গান ” ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রি, এখানে থেমো না” এত বছর আগে গাওয়া একটা গান, এই অসময়ে যখন আমরা ভালো নেই, প্রতিনিয়ত হেরে যাচ্ছি, লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছি, এখনও আমরা যদি শুনি “আমি শ্রান্ত যে, তবু হাল ধর/আমি রিক্ত যে, সেই সান্ত্বনা ” একইরকমভাবে মনের মধ্যে সাহস পাই, যেন মনে হয় আরো অনেক পথ হাঁটা বাকি “এ যে রাত্রি, এখানে থেমো না” হ্যাঁ সত্যিই এই দুঃসময় এই অন্ধকার কেটে যাবে একদিন নতুন ভোর হবে৷ তাই এখানে থেমো না, “বহু যুগ ধরে ধরে করেছে তারা সূর্য রচনা। “

You may also like

1 comment

Leave a Reply!