Home দেশ রাইসিনা হিলের প্রথম বাঙালি তিনি, কেমন ছিল প্রণব মুখার্জির এই সফর?

রাইসিনা হিলের প্রথম বাঙালি তিনি, কেমন ছিল প্রণব মুখার্জির এই সফর?

by banganews

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে সব বাঙালি রাজনীতিতে নিজেদের ক্যারিশমা দেখিয়েছিলেন , তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত এবং উজ্জ্বলতম নাম প্রণব মুখোপাধ্যায়। ২০১২ সালে রাষ্ট্রপতি পদে নিযুক্ত হন প্রণব৷ সক্রিয় রাজনীতি থেকে বিদায় নিলেও রাজনীতির সঙ্কটের নানা মুহূর্তে কংগ্রেসে তাঁর অনুপস্থিতি টের পাওয়া যেত।

১৯৩৫ সালের ১১ ডিসেম্বর বীরভূম জেলার কীর্ণাহারের অদূরের মিরিটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন প্রণব মুখোপাধ্যায় । পিতা কামদাকিঙ্কর ছিলেন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং কংগ্রেস নেতা। উত্তরাধিকার সূত্রেই রাজনীতিতে পদার্পণ৷ সিউড়ির বিদ্যাসাগর কলেজ বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন যদিও ছাত্র রাজনীতি করেননি তিনি । বরং ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষে মন দিয়েছিলেন আইনচর্চায়। তবে পেশাদার আইনজীবী হওয়ার জন্য না৷ জানার জন্যই এসব চর্চা। ডাক ও তার বিভাগে করণিক এবং হাওড়ার বাঁকড়া স্কুলে শিক্ষকতা পর্ব শেষ করে ১৯৬৩ সালে দক্ষিণ ২৪ পরগনার আমতলার অদূরে বিদ্যানগর কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

আরও পড়ুন খবরের আড়ালে রয়ে গেছেন যে প্রণব

ব্রাহ্মণ পরিবারের বউ হবে অব্রাহ্মণ কন্যা! ১৯৫৭ সালে শুভ্রাদেবীকে বিয়ের সময় আত্মীয়-পরিজনেদের একাংশের তরফে নাকি আপত্তি উঠেছিল। কিন্তু এসবে কান দেন নি প্রণব৷ জীবনসঙ্গী হিসেবে শুভ্রাদেবীকেই গ্রহণ করেন৷

বিদ্যানগর কলেজে যোগ দেওয়ার পরে টানা পাঁচ বছর আমতলাতেই ছিলেন প্রণব। প্রায় ছ’কিলোমিটার দূরের কলেজে যেতেন রিক্সা করে। মুখোপাধ্যায় দম্পতি সেখানে পাকাপাকি ভাবে থাকার জন্য জমিও কিনে ফেলেছিলেন। কিন্তু জীবনের মোড় ঘুরে গেল। ১৯৬৬ সালে, বিদ্যানগর কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হরেন্দ্রনাথ মজুমদারের হাত ধরে, শুরু হল রাজনৈতিক সফর।

১৯৬৭ সালের বিধানসভা ভোটে হরেন্দ্রনাথ প্রার্থী হন। প্রণব তাঁর প্রচারে পথে নামেন। রাজ্যের তত্‌কালীন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রণবের বাবা কামদাকিঙ্করের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। ১৯৬৯ সালের বিধানসভা ভোটে রাজ্যের নানা প্রান্তে প্রচারে পাঠানো হয় প্রণবকে।
রাজ্যসভার সাংসদ পদে অভিষেক হয়।
প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধীর নজরে আসেন প্রণব। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৭১ সালে, প্যারিসে ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সভায় যে ভারতীয় প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের স্বাধীনতার হয়ে সওয়াল করেছিল,প্রণব ছিলেন সেখানে অন্যতম সদস্য৷

১৯৭৫ সালে কংগ্রেসের টিকিটে দ্বিতীয়বার রাজ্যসভার সদস্য হন প্রণব মুখোপাধ্যায়৷ যদিও ১৯৭৩ সালে শিল্প প্রতিমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় প্রবেশ।১৯৭৭ সালের লোকসভা ভোটের কংগ্রেসের ভরাডুবির পরে দলের অন্দরে ‘ইন্দিরা হটাও’ স্লোগান জোরদার হয়েছিল। সমস্ত বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও দল বা নেত্রীকে ছেড়ে যান নি তিনি৷ দলনেত্রীর প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নে প্রণব ছিলেন অটল। আর সেই আনুগত্যের পুরস্কার তিনি পেয়েছিলেন পরবর্তীকালে। ১৯৮০ সালে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে শুরু হয় প্রণবের উত্থান।

আরও পড়ুন প্রণব উচ্চারিত হতে থাকে লালমাটির মিরাটিতে

সাফল্যের মাঝে ছিল বহু ব্যর্থতা৷ ১৯৮০ সালের লোকসভা ভোটে দেশজুড়ে প্রবল ইন্দিরা হাওয়ার মধ্যেও বোলপুর কেন্দ্রে সিপিএমের কাছে পরাজিত হন প্রণব। তার বছর তিনেক আগেই ১৯৭৭ এর লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের দুর্গ মালদহে পরাজিত প্রণব। ১৯৮২ সালে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে প্রণব হলেন ইন্দিরা ক্যাবিনেটের ‘নাম্বার টু’। যদিও রাজীব গান্ধীর সঙ্গে সম্পর্ক মধুর হয়নি। ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর, বহিষ্কৃতও হন কংগ্রেস থেকে। রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস নামে নতুন দল গড়ে ১৯৮৭ সালের বিধানসভা ভোটে বহু আসনে প্রার্থী দাঁড় করিয়ছিলেন প্রণব। তাঁদের একজনও জিততে পারেননি।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রিত্বের শেষ পর্বে রাজীব উপলব্ধি করেছিলেন প্রণবের গুরুত্ব। ১৯৮৯ সালের ভোটে কংগ্রেসের হারের পর দলের অন্দরে ফের পুরনো অবস্থানে ফিরতে শুরু করেছিলেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিংহের আর্থিক সংস্কার নীতি রূপায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি।১৯৯৫ সালে বিদেশমন্ত্রীর দায়িত্বও দিয়েছিলেন।

২০০৪-এর লোকসভা ভোটে কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের বিরুদ্ধে রাজ্যওয়াড়ি পাল্টা নির্বাচনী সমঝোতা গড়ায় মূল কারিগর ছিলেন প্রণব। ভোটে অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের পতনের পরে কেন্দ্রে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ হয় ইউপিএ জোটের। আর সেই ভোট প্রণবের জীবনেও এনেছিল নতুন হাওয়া। অধীর চৌধুরীর ‘আমন্ত্রণে’ মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর লোকসভা কেন্দ্রে প্রার্থী হয়ে সেই প্রথমবার জনতার ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হন তিনি।

সুদীর্ঘ কর্মজীবনে বহু বার বিরোধীদের এমনকি, দলের অন্দরেও সমালোচনার শিকার হয়েছেন প্রণব। ভারতীয় গণতন্ত্রের গরিমা আসলে পরমত সহিষ্ণুতা এবং বিরুদ্ধ যুক্তি তুলে ধরার স্বাধীনতায়। বারবার সেকথা প্রমাণ করেছেন তিনি৷ জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে আজ সরকার ও বিরোধীপক্ষের তিক্ততা যখন চরমে, প্রণবের এই শিক্ষাই পাথেয় হতে পারে।

You may also like

1 comment

Leave a Reply!